বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন ফাউন্ডেশন

হাঁস পালনে চ্যালেঞ্জ কেমন, লাভ কতটা?

২৬০

নিউজ ডেস্ক
দেশের সরকারি বেসরকারি গবেষকদের হিসেবে এ মুহূর্তে দেশে হাঁসের পরিমাণ প্রায় চার কোটি এবং রোগ বালাইয়ের ঝুঁকি কম থাকার পাশাপাশি খাদ্য খরচ কম বলে এ খাতটিকে সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন তারা।

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অফ এনিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্সের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর ড: মো: রুহুল আমিন বিবিসি বাংলাকে বলছেন গত দু দশকে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের বিস্তৃত হাওড় এলাকায় হাঁস চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে।

“এ বিপ্লবে বড় ভূমিকা রেখেছেন বিদেশি জাতের হাঁসগুলো। পাশাপাশি আমরাও গবেষণা করছি যে বাংলাদেশের জন্য উপযুক্ত অধিক উৎপাদনশীল হাঁসের জাত উদ্ভাবনে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

তিনি জানান সম্প্রতি পিকিং জাতের হাসের সাথে নাগেশ্বরী জাতের হাঁসের ক্রস করে নতুন জাতের উদ্ভাবন করেছেন তার একদল সহকর্মী।

“জাত উন্নয়নের কাজ করছি আমরা। যে জাত বেশি ডিম দিবে কিন্তু রোগ বালাই কম হবে এমন জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে। আগে শুধু দেশী হাঁস ছিল যা বছরে ৪০-৫০ টি ডিম দিতে পারতো। কিন্তু এখন অনেক জাত আছে যেগুলো থেকে বছরে দুশ’র বেশি ডিম পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমরা আরও ভালো জাত উদ্ভাবন করতে চাই। সেজন্য কাজ চলছে,” বলছিলেন মিস্টার আমিন।

তবে জানা গেছে হাঁসের ডিম ও মাংস উৎপাদনে খামারিরা যাতে বেশি লাভ করতে পারে আবার মানুষও যাতে ন্যায্যমূল্যে এগুলো পেতে পারে এজন্য দেশি বিদেশি জাতের হাসের সংকরায়ন নিয়ে অনেক গবেষণা হচ্ছে নানা পর্যায়ে।

সরকারি হিসেবে এখন দেশে হাঁসের খামার আছে প্রায় আট হাজার। তবে নিবন্ধিত খামারের বাইরেও ব্যক্তি উদ্যোগে দেশের নানা জায়গায় গড়ে উঠেছে হাঁসের খামার।

তাই সব মিলিয়ে প্রকৃতপক্ষে হাঁসের সংখ্যা বা নিয়মিত তা থেকে কি পরিমাণ ডিম উৎপাদন হয় তা নিরূপণ করা কঠিন।

নেত্রকোনার হাওড় এলাকায় প্রায় ত্রিশ হাজার হাঁসের একটি খামার আছে মোহাম্মদ ইয়াছিন মিয়ার। তিনি বলছেন হাঁস চাষ লাভজনক কয়েকটি কারণে। এগুলো হল খাবার খরচ কম ও হাঁসের রোগ বালাই তুলনামূলক কম হয়।

“হাওরেই চাষ করি তাই আমার জায়গা দরকার হয়না। খাবার হাস হাওর থেকেই খেয়ে নেয়। শুধু ৩০/৪০ জন লোক রেখেছি ব্যবস্থাপনার জন্য। গড়ে ৮০-৩০০ ডিম পাই বছরে হাস প্রতি।

ড: মো: রুহুল আমিন বলছেন হাসের ক্ষেত্রে সুবিধা হল এর জন্য খাবার খরচ খুব একটা হয়না কারণ হাঁস প্রাকৃতিক উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেশি।

তিনি বলছেন বাংলাদেশে পুকুর আছে এমন অধিকাংশ বাড়িতেই আগে হাস পালন করা হতো। এখন পুকুর কমলেও বিদেশী জাতের হাঁস আসায় উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ।

ময়মনসিংহেই সরকারি হাস প্রজনন খামারের ব্যবস্থাপক সারোয়ার আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন ভালো জাতের হাঁস আর জলাভূমি থাকলে হাঁস পালনই হতে পারে সবচেয়ে ভালো প্রকল্প।

“মুরগী বা এ ধরনের অন্য প্রাণীর ক্ষেত্রে খাবার খরচই অনেক লাগে। অথচ হাঁসের ক্ষেত্রে উল্টো। এরা বিস্তীর্ণ হাওর বাওর, নদ-নদী, খাল বিল কিংবা পুকুর জলাশয়ে দলবদ্ধভাবে ঘুরতে ও খাবার সংগ্রহ করতে পছন্দ করে। অন্তত ত্রিশ ভাগ খাবার তারা এসব জায়গায় পায়। তাই খাবার খরচ অনেক কম। আর হাঁসের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগের খুব একটা দরকারই হয় না।

হাঁস ও হাঁসের জাত:

গবেষক ও খামারিরা বলছেন হাঁস একেবারে প্রাকৃতিক পানি থেকেই মাছ, ঝিনুক, শামুক, পোকামাকড়, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি খেয়ে থাকে বলে তাদের অন্য খাদ্যের প্রয়োজন খুব কম। আবার পুকুরে হাঁস চাষ করলে সার ও মাছের খাদ্য ছাড়াই মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে তিন ধরনের হাঁস সুপরিচিত- পাতি হাঁস, চীনা হাঁস আর রাজহাঁস। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এসব হাঁস দীর্ঘকাল ধরেই সহজভাবেই লালন পালন করা সম্ভব হচ্ছে।

তাছাড়া দেশের যে কোন জায়গাতেই হাঁস চাষ সম্ভব বলে বলছেন সরকারি হাঁস প্রজনন খামারের ব্যবস্থাপক সারোয়ার আহমেদ।

তবে পুকুরে চাষ করলে হাঁস থেকে বেশি লাভ আসতে পারে কারণ এখানেই হাঁস বেশি প্রোটিন পায়।

প্রফেসর ড: মো: রুহুল আমিন বলছেন বাংলাদেশে এখন দেশী হাঁসের বাইরে খাকি ক্যাম্পবেল, জিংডিং, ইন্ডিয়ান রানার, পিকিং ও মাসকোভি জাতের হাঁস বেশি দেখা যায়।

এর মধ্যে দেশী হাঁস ডিম ও মাংস উৎপাদন করে থাকে, বছরে ৭০-৮০ টি ডিম দেয়। কিন্তু উন্নত ব্যবস্থাপনায় এগুলো ( দেশি সাদা ও দেশি কালো) বছরে প্রায় ২০০-২০৫ টি ডিম দিতে সক্ষম।

খাকি ক্যাম্পবেল হল ডিম উৎপাদনের জন্য। বছরে এ ধরণর একটি হাঁস গড়ে আড়াইশ থেকে তিনশ ডিম দিতে পারে।

জিংডিং ও ইন্ডিয়ান রানারও আড়াইশর মতো ডিম দিতে সক্ষম।

কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরামর্শ:

সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস বলছে হাঁসের বাসস্থানের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা উচিত। এগুলো হল:

১. উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে যেন বন্যার সময় পানিতে ডুবে না যায়।

২. বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের পর্যাপ্ত সুবিধা থাকতে হবে।

৩. ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৪. মাংস ও ডিম বাজারজাত করার সুবিধা থাকতে হবে।

৫. পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৬. পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৭. চারপাশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে।

৮. খোলামেলা ও নিরিবিলি পরিবেশ হতে হবে।

জনপ্রিয়তা আছে রাজহাঁসেরও:

দেশের গ্রামে গঞ্জের অনেক বাড়িতেই দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় গলা লম্বা ও লম্বা ঠোটের এক ধরণের হাঁসের -যেটা পরিচিত রাজহাঁস নামে।

সরকারি তথ্য বাতায়নে বলা হয়েছে রাজহাঁস তার পারিপার্শ্বিক প্রতিটি জিনিসের সঙ্গে খুব সহজেই ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে এবং সেই সুবাদে যে কোন অপরিচিতি শব্দ, লোকজন, জন্তু, জানোয়ার দেখামাত্র এরা প্যাঁক-প্যাঁক শব্দ করে আশপাশের সকলকে তটস্থ করে তোলে।

এমনকি প্রবল উত্তেজনায় অনেক সময় আক্রমণ পর্যন্ত করে বসে। রাজহাঁসের মধ্যে পাহারাদারি কাজে চীনা রাজহাঁস বেশি দক্ষ।

রাজহাঁসের ডিম ও মাংস যেমন পাওয়া যায় তেমনি রাজহাঁসের পালক দিয়ে গদি, লেপ, তোষক, তাকিয়া, কুশন এক কথায় বসবার এবং হেলান দেবার সব জিনিস তৈরি করা যায়।

Niyog Biggopti

Leave A Reply

Your email address will not be published.